মেঘালয় শিলং

জাফলং ঘুরতে গেছে, আর মেঘালয় এর সেই দুই পাহাড়ের মাঝের ঝুলন্ত ব্রিজ ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে ছবি তুলে নাই, এরকম লোক পাওয়া দুষ্কর। আমি জাফলং যাই যখন ক্লাস সিক্স কি সেভেন এ পড়ি। তখন মেঘালয় এর পাহাড় গুলা দেখে অনেক লোভ হয়েছিল। ইস্‌, যদি যেতে পারতাম। বিশেষ করে সেই ব্রিজ টা। এমন মুহূর্তে মানুষ সাধারণত সংকল্প করে, বড় হয়ে একদিন অবশ্যই যাব। আমি সেরকম কিছু করি নাই। ওখানে যাওয়া যাইতে পারে, ঐ কল্পনা করার ক্ষমতাও হয় নাই তখন। আমার মামার বাড়ি ছিল সুনামগঞ্জ, ইন্ডিয়ার বর্ডার এর পাশে। পাশেই মেঘালয় এর পাহাড় গুলা। দেখলে মনে হত যে হাতের কাছে, চাইলেই চলে যাওয়া যায়। কিন্তু সেগুলো তখন স্বপ্নই থেকে গেল।

ডাউকি জাফলং মেঘালয়
ডাউকি ব্রিজ, মেঘালয়

সাল ২০১৮, মেঘালয় বাইক নিয়ে চষে বেড়ানোর একটা প্ল্যান করতেছি। এতদিন দূর থেকে যেই পাহাড় গুলো দেখতাম, সেখানে বাইক নিয়ে ঘুরে বেড়াব, এইটা তো কল্পনার মতো। বিশেষ করে জাফলং এর সেই ব্রিজ টা। যেটা সবাই দূরে দাঁড়ায় দেখে, সেটা এবার কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাওয়া যাবে। এছাড়াও যাব চেরাপুঞ্জি তে। স্কুলে পড়েছিলাম, সারাদিন নাকি বৃষ্টি হয় সেখানে। একবার দেখে আসা দরকার বিষয়টা। মেঘালয় এর প্ল্যান করতে যেয়ে মনে হচ্ছিল, তারা স্বরবর্ণ খুব একটা পছন্দ করে না। গুগল ম্যাপ এ যায়গার নাম দেখে উচ্চারণ করাই মুশকিল হয়ে যায়। যেমন: “Mawlynnong”, “Shnongpdeng”. কোথাও যদি রাস্তায় হারায় যাই, কাউকে যে জিজ্ঞেস করব, অমুক যায়াগা কোথায়, সেইটাও মুশকিল হয়ে যাবে। যাই হোক, আমার আসাম এ পরিচিত বাইক রেন্টার ছিল, তার লিংক ধরে বাইক ভাড়া করলাম শিলং এ।

এরপর মে দিবসে, মানে ১মে আমরা বের হয়ে যাই মেঘালয়ের উদ্দেশ্যে। আমরা মানে হচ্ছে, আমি আর বন্ধু নোমান। ওর সাথে এর আগে ১১ দিন ধরে নেপালে অন্নপূর্ণা বেইস ক্যাম্প ট্র্যাক করে আসি। ওই সিরিজের লেখা গুলো এখানে পাবেন।

ডাউকি মেঘালয়

ডাউকি থেকে শিলং

২মে সিলেটের তামাবিল বর্ডার ক্রস করে আমরা রওনা দেই শিলং এর উদ্দেশ্যে। বর্ডার এ আরও দুইজন কে জুটিয়ে, ৪ জন মিলে ট্যাক্সি ভাড়া করি। ড্রাইভারের নাম “আলিম”। তার কথা মতে, সে শিলং এর ড্রাইভার দের সর্দার। সব জায়গায় তার জানাশোনা আছে। বাংলাদেশেও নাকি তার সেই পাওয়ার। মন্ত্রী মিনিস্টার লেভেলে তার যোগাযোগ। প্রায়শই বিভিন্ন বড় মাপের লোকজন তাকে কল করে আগেই বুক করে রাখে। আমাদের কপাল ভালো, তাকে আজকে ফ্রি পাইসি। তা নাহলে সে দামাদামি করে যাত্রী তুলে না। আলিম ভাই তার ফোন নাম্বার দিয়ে দিল, যাতে আমার পরিচিত কেও মেঘালয় গেলে তার সাথে যোগাযোগ করতে পারে। নাম্বার কাউকে দেই নাই, আমি ছোট মানুষ, মন্ত্রী মিনিস্টার লেভেলের ফ্রেন্ড আমার নাই। তাও যদি কারো লাগে, এইটা তার নাম্বার +৯১৯৪৮৫১৬৪৯৩৯

শিলং এ এসে বাইক নিব “জিয়া” নাম এর একজন এর কাছ থেকে। জিয়া ভাই এর ব্যবসা বিশেষ বড় না। ৪-৫ টা বাইক আছে, বাসার সামনে রাখে, টুরিস্ট আসলে ভাড়া দেয়। ভাই মনে হয় বাসায় নাই, বাসার এক মহিলা বের হয়ে আমাকে বাইক বুঝায় দিল। সব কাগজপত্র নেয়ার পর মহিলারে জিজ্ঞেস করলাম, “জিয়া” ভাই কই। মহিলা বলে “আমিই জিয়া”। আমি তো টাশকি খেয়ে গেলাম, এতদিন ধরে তো ভাবছিলাম জিয়া পুরুষ মানুষ। কারো যদি মেঘালয় যেয়ে বাইক ভাড়া করার শখ থাকে, এইটা জিয়া’র নাম্বারঃ +৯১৯৭৭৪৭৬২৩২৪

একটা রয়েল এনফিল্ড ক্লাসিক ভাড়া করি। নোমান পিছনে বসবে। বাইকের সাইডে দুইজন এর দুইটা ব্যাগ পলিথিন দিয়ে ঢেকে বেধে দিলাম। মেঘালয় এর কোন গ্যারান্টি নাই। হুট করে কখন বৃষ্টি চলে আসবে, তা স্থানীয় ও রাও বলতে পারে না।

শিলং থেকে সোনেংপেডেং

জাফলং এ যেয়ে, আমরা যেই ঝুলন্ত ব্রিজ দেখতে পাই, তার নাম ডাউকি ব্রিজ। ডাউকি হচ্ছে তামাবিল বর্ডার এর পরে, মেঘালয় এর প্রথম গ্রাম। এখান থেকেই আমরা ট্যাক্সি নেই বর্ডার পার হবার পর। শিলং থেকে বাইক নিয়ে, সেই একই রাস্তা ধরে আবার যাব ডাউকি তে। কারণ, সেখান থেকে প্রায় ৭ কিমি দূরে আছে “সোনাংপেডেং”, ডাউকি নদীর পাড়ে ছোট একটা গ্রাম। স্থানীয়রা জায়গাটার নাম যেভাবে উচ্চারণ করে, সেইটা বাংলা ভাষায় লেখা সম্ভব না। তাই কাছাকাছি একটা শব্দ লিখলাম। । মাঝে মধ্যে ইন্টারনেটে কিছু জায়গার ছবি দেখা যায়, যেখানে পানি এতো পরিষ্কার, দেখে মনে হয় যেন নৌকা বাতাসে ভাসতেছে। এইটাই সেই জায়গা। আজকের প্ল্যান হল, নদীর পারে বাইক রেখে ক্যাম্প করব। এর আগে কখনো ক্যাম্প করি নাই। তাই আমার জন্য এইটা একটা নতুন অভিজ্ঞতা।

মেঘালয় শিলং
ডাউকি শিলং হাইওয়ে
নোমান, রাস্তায় চিল করার মাঝে

শিলং থেকে ডাউকি যাবার রাস্তা টা অসাধারণ। হঠাত মেঘ এসে পুরো রাস্তা ঢেকে ফেলবে, কিচ্ছু দেখা যাবে না। ঠান্ডায় দাতে দাঁত বাড়ি লাগার যোগাড় হবে। আবার হুট করে মেঘ থেকে বের হয়ে এসে দেখব চকচকে রোদ, ঠাণ্ডা গায়েব। পাহাড়ের গা বেয়ে, সাপের মতো উপরে উঠে যেতে হবে শুরুতে। এরপর অনেক টাই সমতল। মেঘালয় এর পাহাড়ের ল্যান্ডস্ক্যাপ টা অদ্ভুত। সমতল থেকে খাড়া উঠে যায়, এরপর উপরে পুরো সমান। অনেকটা মালভূমির মতো ব্যাপার।

মেঘালয় শিলং
ডাউকি শিলং হাইওয়ে

বাইক নিয়ে আসার সুবিধা হল, যখন যেখানে মনে চায়, দাড়াও যাও। যতক্ষণ ইচ্ছা এঞ্জয় কর, ছবি তুল, কানের কাছে ট্যাক্সি ড্রাইভার এসে যাওয়ার জন্য প্যান প্যান করবে না। আর পাহাড়ের কার্ভ ধরে বাইক চালানোর যে থ্রিল, তার তো কোন তুলনাই হয় না। নোমান কে বললাম গান ধরতে। এমনিতে তার গানের গলা ভয়ংকর। কিন্তু তখন খুব একটা খারাপ লাগে নাই।

সন্ধ্যা নাগাদ আমরা পৌছে যাই স্নোংপেডেং। সেখানে গিয়ে টেন্ট ভাড়া করার চেষ্টা করি। এক রাত ২০০ রুপি হিসাবে একটা টেন্ট নেই। যে টেন্ট ভাড়া দিল, তার নাম “ব্লু স্টার”। এরকম নাম বাপের জন্মে শুনি নাই। এইটা তার পিতৃদত্ত দেয়া নাম, নাকি নিজের কুল হওয়ার চেষ্টা, আমার জানা নাই। টেন্ট এর পাশে এক জায়গায় বাইক পার্ক করে, জায়গাটা ঘুরতে বের হলাম। নদীর উপরে আরেকটা ঝুলন্ত ব্রিজ। ওইটার উপর যেয়ে সন্ধ্যা টা পার করে দিলাম। কারো “ব্লু স্টার” এর সাথে যোগাযোগ করার ইচ্ছা জাগলে, এইটা তার নাম্বারঃ +৯১৯৮৬২৬৮৯১১৮

ডাউকি মেঘালয় শিলং
সোনেংপেডেং, ডাউকি

টেন্ট যেরকম ভেবেছিলাম, নদীর একদম পাশে হবে, তা আসলে না। পাহাড়ী নদী, পাশে পাথর দিয়ে ভরা। সেখানে টেন্ট করা সম্ভব না। তা নিয়ে খুব একটা আক্ষেপ ও নাই আসলে। কারন বাহিরে যেই পরিবেশ। মনে হচ্ছিল টেন্ট নেয়ার কি দরকার, নদীর পাড়েই তো রাত পার করে দেয়া যায়। নদীর কড়া স্রোত, পাথরে বাড়ি খেয়ে যে শব্দ তৈরি করে, এর চেয়ে সুন্দর কিছু আর হতে পারে না। একটু দূরে ঘর গুলোতে মিট মিট করে লাইট জ্বলছে। দেখে মনে হয় পাহাড়ের গায়ে যেন জোনাকি পোকার মেলা। চাদের আলো ছাড়া আর কোন আলো নাই। বড় দেখে একটা পাথরের উপর শুয়ে চোখ বন্ধ করে প্রকৃতির সাউন্ড শুনতে লাগলাম। একটু পড়ে ব্লু স্টার আমাদের সাথে এসে যোগ দিল। সে হিন্দি পারে না। ভয়ংকর খাসিয়া এক্সেন্ট এর সাথে হিন্দি মিক্স করলে যে ভাষা দাঁড়ায়, সেরকম কিছু একটা ভাষায় কথা বলে। তার হিন্দি ডিকোড করতে যেয়ে, আমার নিজের যা হিন্দি জ্ঞান ছিল, তা নিয়ে সন্দেহ লাগা শুরু করল। তাতে অবশ্য আড্ডা থেমে থাকে না।

ডাউকি মেঘালয় শিলং
সোনেংপেডেং, ডাউকি নদী। এখানেই ক্যাম্প করি আমরা
ডাউকি মেঘালয় শিলং
এরকম রেডিমেড ক্যাম্প ভাড়া পাওয়া যায়

মনে হচ্ছিল রাত টা এখানেই পার করে দেই। কিন্তু অনেক ঠান্ডা, সাথে প্রচন্ড বাতাস, বাইরে থাকা মুশকিল করে দিচ্ছিল। তাছাড়া পরের দিন চেরাপুঞ্জির উদ্দেশ্যে রওনা দিতে হবে। পথে থামব পান্থুমাই ঝরনা। যেই ঝরনা আমরা দেশে দূর থেকে দেখে চলে আসি, কাল সেটা একদম কাছে থেকে দেখার সুযোগ আসবে। এছাড়াও যাব “মাউলিনং” গ্রাম, যেটা কিনা দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে পরিষ্কার গ্রাম। তাই ভালো ঘুম দরকার। টেন্ট এ ঢুকে দ্রুত শুয়ে পরলাম। নদীর কুল কুল শব্দে কিছুক্ষণেই চোখ বন্ধ হয়ে আসে।

চেরাপুঞ্জি নিয়ে পরের পর্বে লিখব। থাকবে ডাবল ডেকার রুট ব্রিজ এর ট্রেকিং নিয়েও। লেখা গুলো নিয়ে জানতে  সাবস্ক্রাইব করুন 🙂

আমার আরো রোড ট্রিপ দেখতে পারেন এখানে

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।